বাগেরহাটে হেভিওয়েট প্রার্থীদের সঙ্গে লড়বেন নবীনরা

এস এম রাজ, বাগেরহাট প্রতিনিধি, পিটিবিনিউজ.কম। ওয়েবসাইট: www.ptbnewsbd.com

0

বাগেরহাট জেলাজুড়েই বইতে শুরু করেছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। বাগেরহাট জেলায় সংসদীয় আসন (৯৫-৯৮) চারটি। এই চারটি আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি থেকে কে কোন আসনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন, এ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এ দুটি প্রধান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশি নবীন নেতাদের এলাকাবাসিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সাটানো পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে হাট-বাজার, জনপদ।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, তার ছোট বোন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা বা বঙ্গবন্ধুর ভাতিজা শেখ হেলাল উদ্দিনের মধ্যে কে বাগেরহাট- ১ আসন থেকে আগামী সংসদ নির্বাচন করেবেন? বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বা তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা এই আসনে নির্বাচনে করলে বর্তমান সাংসদ বঙ্গবন্ধুর ভাতিজা শেখ হেলাল কি বাগেরহাট সদর আসন থেকে নির্বাচন করবেন? তাহলে সদর আসনের বর্তমান সাংসদ রাকসুর সাবেক ভিপি এ্যাডভোকেট মীর শওকাত আলী বাদশা কি মনোনয়ন বঞ্চিত হবেন? বিগত ভোটারবিহীন নির্বাচনে হারতে-হারতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগের তৎপরতায় জয়ী হওয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীন নেতা ডা. মোজ্জাম্মেল হোসেন আগামী তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনেও কি দলীয় মনোনয়ন পাবেন? এসব বিষয়ের পাশাপাশি আলোচিত হচ্ছে আগামী সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট জেলার সবকটি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের ভিআইপি বা হেভিওয়ট প্রার্থীদের সঙ্গে বিএনপিদলীয় তরুণ প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বা জয়-পরাজয়ের আগাম হিসেব নিয়ে।

সংসদীয় আসন – ৯৫, বাগেরহাট – ১ (মোল্লাহাট- ফকিরহাট ও চিতলমারী) আসন:
গোপালগঞ্জ- টুঙ্গিপাড়ার সীমান্তে মধুমতি নদীর অপর পাড়ের এই সংসদীয় আসনটিতে বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাটি। এই আসন থেকে নির্বাচন করে থাকেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগে প্রার্থী বিজয়ের শত ভাগ নিশ্চিত এই আসনটিতে এবার প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি তার ছোট বোন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার প্রার্থী হবার বিষয়টি দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মুখে-মুখে আলোচিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এই আসন থেকে নির্বাচন না করলে বঙ্গবন্ধুর ভাতিজা বর্তমান সাংসদ শেখ হেলাল উদ্দিন নির্বাচন করবেন। শেখ হেলাল এই আসন থেকে নির্বাচন না করে বাগেরহাট সদর আসন থেকে নির্বাচন করলে প্রার্থী হিসেবে তাঁর ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়ের নাম আলোচিত হচ্ছে। শেখ তন্ময় ইতিমধ্যেই তাঁর পিতার আসনসহ বাগেরহাট সদর আসনে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের নিশ্চিত এই আসনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর ভাতিজা শেখ হেলালের কাছে একাধিক বার পরাজিত জেলা বিএনপির উপদেষ্টা শেখ মজিবর রহমান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি এ্যাডভোকেট শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপু আবারো বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন বলে তাদের কর্মী-সমর্থকরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এ দুই প্রার্থীকে টেক্কা দিয়ে দলীয় প্রার্থী হতে মাঠে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন জেলা বিএনপির অপর সহসভাপতি মেরিন ইঞ্জিনিয়ান মাসুদ রানা। ক্লিন ইমেজের দক্ষ এই প্রার্থী মাঠ পর্যায়ে হামলা-মামলার স্বীকার নেতা-কর্মীদের সব রকম সহযোগিতাসহ এলাকায় শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলেছেন।

সংসদীয় আসন – ৯৬, বাগেরহাট – ২ (বাগেরহাট সদর ও কচুয়া) আসন:
বাগেরহাট সদরের এই আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে এক বার আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হলে পরের নির্বাচনেই বিজয়ী হন বিএনপির প্রার্থী। তবে বিগত সেনা সমর্থিত সরকারের সময়ের নির্বাচন থেকে দুই দফায় আওয়ামী লীগের দখলে এই সদর আসনটি। এই আসনটি থেকে কয়েক বার নির্বাচিত সাংষদ অধ্যাপক মীর সাখাওয়াত আলী দারু’র অসুস্থজনিত কারণে তাঁর ভাই রাকসুর সাবেক ভিপি এ্যাডভোকেট মীর শওকাত আলী বাদশা আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বর্তমানে পরপর দুই বার নির্বাচিত সাংসদ। তাঁর অসুস্থ ভাই সাবেক সাংসদ মীর সাকাওয়াত আলী দারুর এই আসনে রয়েছে ক্লিনইমেজ। বর্তমান সাংসদ মীর বাদশা এবারো দলীয় মনোনয় চাইবেন। তবে জেলা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বর্তমান সাংসদ’র সৃষ্টি হয়েছে জোজন-জোজন দূরত্ব। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাগেরহাট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু বলেছেন, দলের তৃর্ণমূলের কর্মী-সমর্থকসহ আমরা চাই সদরের এই আসনটিতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের যেকোনো সদস্য নির্বাচন করুক। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা, শেখ হেলাল বা তার ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়ের মধ্যে যেকোনো একজন নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই বিজয়ী হবে। তবে এই আসনে এরা কেউ প্রার্থী না হলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের নিকট আত্মীয় জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেশনা সম্পাদক, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আহাদ উদ্দিন হায়দার এবং জেলা তাঁতীলীগের সভাপতি, বাগেরহাট পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বাকী তালুকদার দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। অপরদিকে বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম এই আসনে বিএনপির একক প্রার্থী। বয়সে তরুণ এই নেতা নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠনকে শক্তিশালী করাসহ গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক হাজরা শহিদুল ইসলাম বাবলু এ আসনে দলীয় প্রার্থী।

সংসদীয় আসন – ৯৭, বাগেরহাট – ৩ (রামপাল ও মোংলা) আসন:
এই আসনটি ৯১ সাল থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমান সাংসদ তালুকদার আব্দুল খালেক খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলে ২০০৮ সালে তাঁর স্ত্রী তালুকদার হাবিবুন নাহার এই আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। এছাড়া প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেক আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন। ’৯৬ আওয়ামী লীগ সরকারের তিনি ছিলেন ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী। এবারো তালুকদার আব্দুল খালেক এই আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী। ৯১ সাল থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সবকটি নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারি জামাতের প্রার্থী একবারো জয়ী হতে পারেনি। সেকারণে এবার এই আসনটিতে সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ড. শেখ ফরিদুল ফরিদুল ইসলাম মনোনয়ন পেতে ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও ক্লিন ইমেজের এই প্রার্থী মাঠ পর্যায়ে হামলা-মামলার স্বীকার নেতা-কর্মীদের সব রকম সহযোগিতাসহ অসহায় দরিদ্রদের চিকিৎসা ও অর্থিক সাহায্য করে এলাকায় সাড়া ফেলে দিয়েছেন। বিএনপির একক এই প্রার্থী আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলবে এমনটাই বলছেন ওই আসনের সাধারণ ভোটাররা। তবে, জামাত বলছে, জেলা জামাতের সিনিয়র নায়েবে আমির এ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল ওয়াদুদ জোট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন।

সংসদীয় আসন – ৯৮, বাগেরহাট – ৪ (মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা) আসন:
এই আসনটিতে একবার জয়ী হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী। অন্যবার জয়ী হয় বিএনপি-জামাত জোটের জামাতের প্রার্থী। বিগত সেনা সমর্থিত সরকারের সময়ের নির্বাচন থেকে এবারো এই আসনের সাংসদ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোজাম্মেল হোসেন। তবে সর্বশেষ ভোটারবিহীন নির্বাচনে জেলার অন্য তিন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও ডা. মোজাম্মেলকে দলের দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে নির্বাচন করে বিজয়ি হয়। আগামী নির্বাচনটি তীব্র-প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় ডা. মোজাম্মেলকে এবার মনোনয়ন দৌঁড়ের প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলায় তীব্র দলীয় কোন্দলের মধ্যে এবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

মোড়েলগঞ্জের সন্তান সোহাগ বলেছেন, তিনি আগামী নির্বাচনে বাগেরহাট- ৪ আসন থেকে প্রার্থী হতে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। তবে সোহাগ ছাড়াও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য এবং মোড়েলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাডভোকেট আমিলুল আলম মিলনও দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি-জামাত জোট থাকলে এই আসনে এবার জামাত থেকে প্রার্থী হবেন অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম। আর বিএনপি এককভাবে প্রার্থী দিলে মোড়েলগঞ্জের সন্তান কেন্দ্রীয় বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ড. কাজী মনির, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি কাজী খাইরুজ্জামান শিপন ও জেলা বিএনপির যুগ্মসম্পাদক সাবেক চেয়ারম্যান খান মতিয়ার রহমান দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে তারা জানিয়েছেন। জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে দলটির সংখ্যালঘু বিষয়ক উপদেষ্টা সোমনাথ দে এই আসনে জাপার প্রার্থী হিসেব তৃর্ণমূলে গণসংযোগ করছেন।

সম্পাদনা : অরুন দাস।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page