নৌ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে কথিত ঘুষদাতার বক্তব্য

সেন্ট্রাল ডেস্ক, পিটিবিনিউজ.কম। ওয়েবসাইট: www.ptbnewsbd.com

0
নৌ পরিবহন অধিদপ্তর

* অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে বদরুলের গোপন ফোনালাপের অডিও ফাঁস
* বদরুলের বক্তব্যে ফখরুলকে ঘুষ দেয়ার আগে দুদকের কাছে অভিযোগ দায়ের, ঘটনার দিন পাঁচ লাখ টাকা দুদকে জমা দেয়া ও ইনভেন্টরি করানোর তথ্য নেই
* বদরুলের বক্তব্য সত্য হলে ফখরুলের বিরুদ্ধে করা মামলায় দুদকের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন
* ঘটনার সঙ্গে অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা জড়িত থাকার দাবি বদরুলের

* বদরুলের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ও বানোয়াট। ফখরুল ইসলাম আমাদের কোনো ক্ষতি করেননি, তাঁকে গ্রেপ্তারের পেছনে আমাদের কোনো স্বার্থও নেই। এ ধরনের মিথ্যাচার স্বার্থান্বেষীদের ষড়যন্ত্র: দুই কর্মকর্তার দাবি 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পেছনে তাঁর- ই দুই সহকর্মীর হাত রয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগকারী ও কথিত ঘুষদাতা বেঙ্গল মেরিন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস (নকসা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান) এর অথরাইজড কর্মকর্তা নেভাল আর্কিটেক্ট (নৌ স্থপতি) এ এন এম বদরুল আলম (রাতুল) নিজেই এই গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছেন। রাতুলের দাবি, বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির জাহাজের নকসা যথাসময়ে অনুমোদন না করায় তাঁরা ফখরুল ইসলামের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাঁদেরকে ব্যবহার করে ফখরুলকে গ্রেপ্তার করানো হয়েছে। খবর সাপ্তাহিক পাঠকের কন্ঠ।

রাতুলের দাবি, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নৌ অধিদপ্তরের একজন নেভাল আর্কিটেক্ট ও একজন মাস্টার মেরিনার ছাড়াও সরকারদলীয় একজন প্রভাবশালী সাংসদ, বিএনপির সাবেক এক প্রভাবশালী সাংসদ এবং এফবিসিআই এর একাধিক পরিচালক, কার্গো- জাহাজ মালিক সমিতির একাধিক নেতা আছেন বলেও দাবি করেছেন বদরুল আলম রাতুল। ফখরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পর অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে আলাপচারিতায় বদরুল আলম রাতুল এসব কথা বলেন। তাঁদের এই আলাপচারিতার ‘অডিও’ সম্প্রতি সাপ্তাহিক পাঠকের কন্ঠ’র হাতে এসে পৌঁছেছে এবং সেটি সংরক্ষিত আছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

তবে অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তা বদরুল আলম রাতুলের বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁরা দু’জনই দাবি করেছেন, রাতুলের বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, অগ্রহণযোগ্য ও অবিশ্বাস্য। ফখরুল ইসলাম গ্রেপ্তারের সঙ্গে তাঁদের জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কেউ বা কোনো মহল রাতুলকে দিয়ে এমন বক্তব্য প্রচার করে স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা চালাতে পারেন। এ ধরনের জঘন্য কাজের সঙ্গে তাঁরা বিন্দুমাত্রও জড়িত নন বলে দাবি করেন দুই কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, জাহাজের নকসা অনুমোদনে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দুদক গত ১৮ জুলাই ফখরুল ইসলামকে রাজধানীর মতিঝিলের বিআইডব্লিউটিএ ভবনের অষ্টম তলায় তাঁর কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি কারাবন্দি আছেন।

এদিকে, গ্রেপ্তারের পর ওইদিন বিকালে ফখরুলের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় দুদকের করা মামলার এজাহারের সঙ্গে বদরুল আলম রাতুলের এই টেলিফোন কনভারসেশনের (ফোনে আলাপচারিতা) ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। এজাহারে বলা হয়েছে, “ফখরুল ইসলামকে ফাঁদ পেতে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে আটক করার জন্য অভিযোগকারী বদরুল আলমের দেয়া ৫,০০,০০০/= (পাঁচ লক্ষ) টাকা অদ্য ১৮/০৭/২০১৭ তারিখ ১০:৪৫ ঘটিকায় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ইনভেন্টরি করে বদরুল আলমের জিম্মায় দেয়া হয়।” তবে অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে আলাপচারিতায় বদরুল আলমের বক্তব্যে এমন তথ্য নেই।

ফখরুলকে গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপট
দুদকের সহকারি পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদের লিখিত এজাহারের পরিপ্রেক্ষিতে মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলার (মামলা নং ২২, তারিখ : ১৮.০৭.২০১৭) অভিযোগে বলা হয়েছে, “রাজধানীর মতিঝিলের ২৮ সি/৩ টয়েনবি সার্কুলার রোডের আদুরী সুরনাজ গার্ডেনের পঞ্চমতলায় অবস্থিত বেঙ্গল মেরিণ এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস লিমিটেডের অথরাইজড পার্সন এ এন এম বদরুল আলম ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের বিভিন্ন তারিখে মোট ২২টি নৌযানের নকসা নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে জমা দেন। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ফখরুল ইসলাম এসব জাহাজের নকসাগুলো অনুমোদনের জন্য তাঁর (বদরুল) কাছে বিভিন্ন সময়ে জাহাজের আকার ভেদে পাঁচ লাখ থেকে ১৬ লাখ টাকা করে ঘুষ দাবি করেন এবং ঘুষ ছাড়া তিনি (ফখরুল) কোনো জাহাজের নকসা অনুমোদন করবেন না বলে জানান। প্রতিটি নকসা অনুমোদনের জন্য তিনি লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে থাকেন। অভিযোগে বলা হয়, মো. শরিফ আহাম্মেদ (গং) এর মালিনাকানাধীন ‘এমভি নওফেল লিহান’ নামের নতুন একটি মালবাহী জাহাজের নকসা অনুমোদনের জন্য বদরুল আলম গত ১৩.০৪.২০১৬ তারিখ অধিদপ্তরে আবেদন করেন। নকসাটি অনুমোদনের জন্য ফখরুল ইসলাম পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। মামলার এজাহারে আরো বলা হয়, ঘুষ দেয়া ও নেওয়া দ-ণীয় অপরাধ বিধায় অভিযোগকারী (বদরুল) ঘুষ প্রদানে নীতিগতভাবে সম্মত না থাকা সত্ত্বেও একজন ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করার উদ্দেশে ১৮.০৭.২০১৭ তারিখ তাঁকে (ফখরুল) পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ প্রদানে সম্মত হন। বদরুল এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত দরখাস্তের মাধ্যমে দুদককে অনুরোধ জানান। এর পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দুদকের ফাঁদ টিম ফখরুল ইসলামকে তাঁর কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে।

বদরুলের টেলিসংলাপ
অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির সঙ্গে বদরুল আলমের ৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ড আলাপচারিতার যে অডিওটি পাওয়া গেছে তাতে ফখরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে নানা কথা বলেছেন বদরুল। অজ্ঞাতনামা ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও তিনি সর্বক্ষণ বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছেন। তাই তিনি জন্মসূত্রে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের বাসিন্দা হতে পারেন বলে ধারণা করা যায়। দু’জনের এই আলাপচারিতার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-
অজ্ঞাত ব্যক্তি : ভাই, স্লামাইকুম, কী অবস্থা, কেমন আছেন?
বদরুল : ঞ্যা.. বহুদিন পরে যোগাযোগ করতেছেন, ঘটনাটা কী?
অজ্ঞাত ব্যক্তি : আরে ভাই, আপনার লগে যোগাযোগ করাও তো সমস্যা। হোনেন, ফোন দিলাম হইলো আগে কন তো দেহি ঘটনাটা কীভাবে ঘটলো, ডিজি শিপিংয়ের যে ঘটনাটা ফখরুল ইসলামের কীভাবে ঘটলো?
বদরুল : ঘটনা ঘটছে ভাই, ঘটনা তো অনেক বড়। আমি আপনাকে সংক্ষেপে বলি বিষয়টা। আমি তো ট্র্যাপের মধ্যে শিকার হইছি। এইটা ২০১২ সালের কিছু নকসা। ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ সালের। প্রচুর নকসা দীর্ঘদিন থেকে ফখরুল স্যার আটকায়ে রাখছে। দিন দিন খালি উনার ওই সময় যে রেটে ছিল ওই রেট থেকে এখন এক লাখ, দুই লাখ করে পাঁচ লাখ, ছয় লাখ, সাত লাখ, আট লাখ থেকে বাড়তে বাড়তে একেবারে ১৬, ১৭, ১৮ লাখ টাকায় চলে গেলো। এখন আমি তো ধরেন পার্টির সঙ্গে একটা চুক্তিতে নেই যে তাকে নকসাটা ডেলিভারি দেবো- তাই না?
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু। হু।
বদরুল : এরম একটা কথা ওনার সঙ্গে আমার ই হইছে। এখন উনি দিন চলে গেছে, নকসার বিভিন্ন অজুহাত, নকসা কয়দিন পরে পরেই নকসার নোটিশ দেয়, নকসা বন্ধ হয়, নকসার নোটিশ দেয়, খোলার কোনো খবর নেই। আর ওই বন্ধের কারণে এখন এটারেই … (এই অংশটুকু অস্পষ্ট)। যাই হোক এখন, ওই যে আগের ডিজি ছিল জাকিউর রহমান, সে কয়দিন পরে পরেই নকসা বন্ধের নোটিশ দিত। একটা নকসা বন্ধের নোটিশ দিত আর এইখান দিয়ে ফখরুল এটার ফায়দা লুটতো আরকি। নকসা বন্ধ, এখন দিতে হলো এতো টাকা লাগবে। আমি যে চুক্তিটা করলাম এই টাকাটা কোত্থেকে দেবো? আমি কী এখন বাপের জাগা-জমি বেচে দিয়ে দেবো? আপনি আমারে জিগান?
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু। না।
বদরুল : এখন এই ঘটনা নিয়া আল্টিমেটলি এইটা নিয়া মালিকদের সাথে আমার প্রচুর রেশারেশি হইছে। ওরা তো একটা টাকা বেশি দিবে না। কোনো অবস্থাতেই ছাড়বেও না। জাহাজের জন্য লোন করছে, জাগা ভাড়া করছে, ইন্টারেস্ট কাটতাছে। এই যে ক্ষতিগুলি….। বোঝছেন? আমার তো একদিন ওই যে বিসিভোয়ার (বাংলাদেশ কার্গো ভেসেলস ওনার্স এসোসিয়েশন) যে সভাপতি তার ফুফাতো ভাই এ রকম মদটদ খেয়ে একদিন আমার বাসায় আইসা ২-৩ দিন, একদিন না ২-৩ দিন সে আমার বাসায় আইসা হামলা করছে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু।
বদরুল : সে আবার মদটদ খায়।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু।
বদরুল : …. (অস্পষ্ট), বোঝছেন? এলাকার মধ্যে আমি কতোটুকু বেইজ্জতি…। এর পরে ওরা এতো সিরিয়াস…। ….. (ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একজন সরকারদলীয় সাংসদের নকসা আটকানো এবং বিএনপির একজন সাবেক সাংসদের চারটি জাহাজ নিয়ে প্রচুর ভোগানোর অভিযোগ। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় নামোল্লেখ করা হলো না)। এঁরা (বর্তমান ও সাবেক দুই সাংসদ) ক্ষুব্ধ।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু।
বদরুল : বিসিভোয়ার সভাপতি তাঁর নকসা, তাঁর নিজের নকসা এবং তাঁর আপন তিন ভাইয়ের নকসা, তাঁর খালাতো ভাই, ফুফাতো ভাই- সবগুলোর নকসা …. (অস্পষ্ট)। এই টোটাল..।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু।
বদরুল : তারপর আপনার এই যে আবার ….. গ্রুপ- এরা আবার ফাইনান্স করেছে হাফিজ ইব্রাহিমের জাহাজগুলোতে। পোদ্দার-টোদ্দার এরা এর আগেও…… (অসম্পূর্ণ বাক্য) যে জাহাজ আটকাইয়া দিছে। এখনও এদের জাহাজের পারমিশন হয়নি। এই তো ……….
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু।
বদরুল : এখন পোদ্দারের সাথে.. (অস্পষ্ট) এই এতোগুলো জাহাজ, ও! এর মধ্যে আরো কিছু নকসা আছে এফবিসিসিআইয়ের বড় বড় মেম্বর যারা আছে তাদেরও নকসা আছে। এই সবাই মিলে এর মধ্যে… (অস্পষ্ট) অখিল পোদ্দার.. ডিউকের (বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক) সাথে, ডিউকের ক্লাসমেট কিন্তু আবার আমাদের জুলফিকার ভাই (নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার মুঈনউদ্দিন জুলফিকার)। ওদের সাথে এদের একটা লিংক আছে ভালো।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু।
বদরুল : আপনার ইয়ে হইছে। এখন, এই, হ্যাঁ …. (অস্পষ্ট)।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : আচ্ছা, এই যে ইয়া করলেন, টাকার ইয়াডা দিল ক্যাডা, ফখরুলরে যে এ্যারেস্ট করলো দুদক, টাকার এ্যারেঞ্জমেন্টটা কীভাবে, টাকার এ্যারেঞ্জমেন্ট কারা করলো?
বদরুল : এখন এই সমস্ত লোকজন এরা খেপছে এবং হয়তো বা কোনো, আমি শুনলাম যে জুলফিকার, উনিও নাকি এইটার সাথে ইনভল্ভড। এদের কাছ থেকে টাকা এনে …. (অস্পষ্ট)।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : জুলফিকার?
বদরুল : হ্যাঁ। দুদকের মাধ্যমে একটা ওনাকে (অসম্পূর্ণ বাক্য)।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : জুলফিকার, না?
বদরুল : হ্যাঁ, দুদকের মাধ্যমে আপনার, দুদকের মাধ্যমে কীভাবে ওনাকে (অসম্পূর্ণ বাক্য)।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : জুলফিকার।
বদরুল : হ্যাঁ, সার্ভেয়ার। জুলফিকার ভাই মানে সার্ভেয়ার জুলফিকার ভাই। ওনারও মনে হয় একটা হাত আছে যতটুক শুনলাম। এদের সাথে একত্রিত হয়ে এরা…. (অসম্পূর্ণ বাক্য)।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : হু।
বদরুল : কিছু অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ বাক্য।

আলাপচারীতার এই পর্যায়ে ঘটনার (ফখরুল গ্রেপ্তার) দিনের বর্ণনায় বদরুল বলেন, প্রথম প্রথম এরা (জাহাজ মালিক) আমার ওপর খুব ক্ষিপ্ত, মাইরা ফ্যালাইবে, ই কইরবে..। পরে দেখি যে যাইয়া বলে যে, টাকা পয়সা নিয়ে যান। ঠিক আছে কতো টাকা লাগবে, দিয়ে দেন, দিয়ে নকসা বের করে দেন। তখন একটা জিনিস আমার মাথায় আসলো যে, ঘটনাটা কী? এতো সিরিয়াস হয়ে গেলো। …. (এরপর বিভিন্ন অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ বাক্য উচ্চারণ)। আমি টাকা নিয়ে যখন নকসা আনতে যাবো সাইন করায়ে, তখন আমাকে বলা হলো, আজকে যদি আপনি নকসা না আনেন ……. (অস্পষ্ট)। কিন্তু আজকে চিঠিটা দিতে হবে, যাতে আমরা কার্যক্রম শুরু করতে পারি। …….. (অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ বাক্য উচ্চারণ)। এখন আপনি জিনিসটা বুঝার চেষ্টা করেন। যা হোক, এরপর তারা আমাকে টাকা-টুকা দিয়ে দিছে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : আপনাকে টাকাডা দেছে ক্যাডা? মালিকরা?
বদরুল : টাকাটা, হ্যাঁ। যারা এইটাকে প্রোভাইড করছে। আমি তো আর জানতাম না। যাই হোক পরে এ্যাজ ইউজাল টাকাটা আমার হাতে আসলো এবং আসার পর আমি চলে গেছি নকসার রুমে।
এরপর বদরুল আরো কিছু কথা বলেন। তবে ফোনালাপের শেষ পর্যায়ে বদরুলের কাছে প্রশ্ন রেখে অজ্ঞাত ব্যক্তি বলেন, আচ্ছা আচ্ছা। ভাই, এই গেমের সাথে মূলত জড়িত কে কে? এই যে ফখরুলরে এ্যারেস্ট করানোর পেছনে …. (কিছু কথা অস্পষ্ট)।
বদরুল : এইতো আপনাকে কি বললাম আমি এতোক্ষণ ধইরা? এই যে একটা, এই যে বিশাল বিভিন্ন গ্রুপ, যাদের নকসা আটকাইছে, এরা। তারপর যতটুক জানলাম, সার্ভেয়ার জুলফিকার, তারপরে আপনার এই যে ইয়ে ক্যাপ্টেন গিয়াস-টিয়াস (নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ) এদের গ্রুপ ধরে জড়িত আছে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : তাই না!
বদরুল : তবে মেইনলি যেটা হইছে..
অজ্ঞাত ব্যক্তি : জুলফিকার।
বদরুল : এই পোদ্দার-টোদ্দারসহ…. ভাই (সরকার দলীয় সাংসদ), … ইব্রাহিম (বিএনপি দলীয় সাবেক সাংসদ), এফবিসিসিআই, বিসিভোয়া- সবাই একত্র হয়ে জোট গঠন করে এ কাজটা করাইছে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : আচ্ছা ঠিক আছে ভাই, …এখন আপনার ওই ই আছে তো, রাত হইয়া গ্যাছে, পরে কথা কমুনে অ্যা।
বদরুল : ওকে, ওকে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : আল্লাহ হাফেজ।
বদরুল : দোয়া কইরেন ভাই, আমি মাঝখান দিয়ে পড়ে একটা বিপদে আছি।
অজ্ঞাত ব্যক্তি : আরে কী অইবো?
বদরুল : আল্লাহ হাফেজ।

এই ফোনালাপে বদরুল অনেক কথা বললেও তাঁর বক্তব্যের কোথায়ও নেই যে, তিনি ১৮ জুলাইয়ের (ফখরুল গ্রেপ্তারের দিন) আগে ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করেছেন। এমনকি ঘটনার দিন সকালে পাঁচ লাখ টাকা দুদকে জমা দিয়ে ইনভেন্টরি (চিহ্নিতকরণ) করিয়েছেন- এমন তথ্যও তাঁর বক্তব্যে নেই। অজ্ঞাত ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে বদরুল একাধিকবার বলেছেন, যাদের জাহাজের নকসা আটকিয়ে রাখা হয়েছে, যাদের জাহাজ চলাচলের পারমিশন আটকিয়ে রাখা হয়েছে তাঁরা জোটবদ্ধ হয়ে দুদককে দিয়ে ফখরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করিয়েছেন। তবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নৌ অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তার কীভাবে জড়িত হলেন, সে বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি।

জুলফিকারের বক্তব্য
এ বিষয়ে গত ১৭ আগস্ট মোবাইল ফোনে আলাপকালে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মো. মুঈনউদ্দিন জুলফিকার এ প্রতিবেদককে বলেন, বদরুলের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ও বানোয়াট। ফখরুল ইসলাম আমার কোনো ক্ষতি করেননি এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের পেছনে আমার কোনো স্বার্থও নেই। আমি কোনো নকসা অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। এছাড়া সাইফুল ইসলাম ডিউক তাঁর সহপাঠী নন এবং দু’জনই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৌ স্থাপত্য বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র হলেও ডিউক তাঁর চেয়ে অনেক জুনিয়র বলে জুলফিকার দাবি করেন। ফখরুল ইসলামকে কথিত ঘুষদাতা বদরুলের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অধিদপ্তরের সর্বজ্যেষ্ঠ উচ্চপদস্থ এই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের মিথ্যাচার শুধু ঘৃণ্যই নয়, বড় ধরনের অপরাধ। এটা স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। ফখরুল ইসলাম চেয়ারচ্যুত হলে যাদের স্বার্থ হাসিল হতে পারে, তাঁরাই এ জাতীয় জঘন্য মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছে বলে দাবি করেন মুঈনউদ্দিন জুলফিকার। তাঁর দাবি, ফোনালাপে বদরুলের বক্তব্যের সঙ্গে দুদকের বক্তব্যের মিল নেই। ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় দুদক বলেছে, বদরুল তাদের (দুদক) কাছে আগেই অভিযোগ করেছিলেন যে একটি জাহাজের নকসা অনুমোদনের জন্য ফখরুল ইসলাম তাঁর কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেছেন। তিনি (বদরুল) ঘটনার দিন সকালে সেই টাকা দুদকে জমা দিয়ে ইনভেন্টরি করিয়ে ফখরুল ইসলামকে দেন এবং দুদক তাঁকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। অথচ ফোনালাপে বদরুল বলছেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না; ঘটনার দিন জাহাজ মালিকরা টাকা দেয়ার পর তিনি নকসা আনতে গেছেন এবং বিশাল বিশাল বিভিন্ন গ্রুপ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে জোট বেধে দুদক দিয়ে ফখরুলকে আটক করিয়েছেন। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে থাকা মুঈনউদ্দিন জুলফিকার আরো বলেন, হয় বদরুল কারো প্ররোচনায় এমন মিথ্যাচার করছে, আর না হয় নিজের দোষ আাঁড়াল করার জন্য অন্যদের ঘাড়ের ওপর বন্দুক রেখে দুদককে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। বদরুলের এই মিথ্যাচার দুদকের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার প্রয়াস দাবি করে এই কর্মকর্তা বলেন, মিথ্যা অপবাদের দায় থেকে দুদককে রক্ষার জন্য অবিলম্বে বদরুলকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত।

ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিনের বক্তব্য
এ বিষয়ে গত ১৬ আগস্ট মোবাইল ফোনে আলাপকালে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের নটিক্যাল সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন মো. গিয়াস উদ্দিন আহমদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ফখরুল ইসলামকে দুদক গ্রেপ্তার করার সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। পাল্টা প্রশ্ন রেখে এই মাস্টার মেরিনার বলেন, ফখরুল ইসলাম গ্রেপ্তার, বরখাস্ত ও তাঁর চেয়ার শূন্য হলে আমার কী চিফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সুযোগ আছে? তাহলে বদরুল কেনো আপনার কথা বললো- এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন গিয়াস বলেন, বদরুল একটা মিথ্যাবাদী। কোনো ক্রিমিনাল তাঁকে দিয়ে এসব বলাচ্ছে। ফখরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর ওইদিনই দুদক বলেছে যে, বদরুল আগেই তাদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। দুদকের কর্মকর্তাদের এই বক্তব্য বাংলাদেশের সকল টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকায় প্রচার হয়েছে। এখন বদরুলের বক্তব্যে মনে হয়, সেদিন দুদক মিথ্যা কথা বলেছিল। ক্যাপ্টেন গিয়াস এ ধরনের জঘন্য মিথ্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আমার বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page