নৌ অধিদপ্তরের এনওসি-তে মানবপাচার: অভিযুক্তদের রক্ষায় দায়সারা প্রতিবেদন

সেন্ট্রাল ডেস্ক, পিটিবিনিউজ.কম। ওয়েবসাইট: www.ptbnewsbd.com

0
নৌ পরিবহন অধিদপ্তর

* নাজুমল হকের স্বাক্ষর জাল : তদন্ত কমিটি
* ক্যাপ্টেন গিয়াস-ক্যাপ্টেন জসিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি
* কর্মচারি মিঠুন চাকী ধরাছোঁয়ার বাইরে
* তিন কর্মকর্তার স্বাক্ষর পরীক্ষায় ‘হ্যান্ডরাইটিং’ ও ‘আইটি’ এক্সপার্টের সহায়তা নেওয়া হয়নি

অবশেষে জমা হয়েছে ‘নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের এনওসি-তে মানব পাচার’ সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন। ঘটনার দীর্ঘ সাড়ে ছয় মাস পর নৌ বাণিজ্য দপ্তরের মূখ্য কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গত ৩ জানুয়ারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে এই প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে বিতর্কিত এনওসিতে করা স্বাক্ষরটি নাজমুল হকের নয় বলে উল্লেখ করে তাঁকে অব্যাহিত দেয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের নিপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইতোমধ্যেই জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ ঘটনা জানাজানির পর এ ধরনের জাল-জালিয়াতির সঙ্গে অধিদপ্তরের কর্মচারি মিঠুন কুমার চাকীর সংশ্লিষ্টতার জোরালো অভিযোগ উঠলেও তাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখায় তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষা মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এছাড়া নিবিড় পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিবেদনে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।

বহুল আলোচিত এই তদন্ত প্রতিবেদনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক কথিত নাবিক মুজাহিদুল ইসলামের কাছ থেকে উদ্ধার করা এনওসিতে কথিত স্বাক্ষরকারী নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার ড. এস এম নাজমুল হককে অব্যাহতি প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিতর্কিত ওই এনওসিতে (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট বা অনাপত্তির ছাড়পত্র) করা নাজমুল হকের স্বাক্ষরটি জাল।

এছাড়া তদন্তকালে ইতোপূর্বে বিমানবন্দরে আটক মুজাহিদুল ইসলামের জবানবন্দিতে এ ধরনের অবৈধ কাগজপত্রে স্বাক্ষরকারী হিসেবে অধিদপ্তরের আরো দুই কর্মকর্তার নাম এসেছে। তাঁরা হলেন নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ও চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার (সিএনএস) ক্যাপ্টেন কে এম জসিমউদ্দীন সরকার। জবানবন্দির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দালাল মারফত তিনি (মুজাহিদ) যে ‘এ্যাডভান্স ফায়ার ফাইটিং সনদ’ পেয়েছিলেন তাতে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদের স্বাক্ষর ছিলো। একই প্রক্রিয়ায় পাওয়া ‘রেকর্ড অব সার্ভিস’, ‘লেটার অব অথেনটিফিকেশন’ ও ‘সার্টিফিকেট অব এন্ডোর্সমেন্ট’- য়ে স্বাক্ষর ছিলো ক্যাপ্টেন জসিমউদ্দীন সরকারের। প্রতিবেদনে তাঁদের কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। এমনকি তদন্ত কমিটি এই দুই কর্মকর্তার জবানবন্দিও নেয়নি। পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিতর্কিত এনওসিসহ এ সংক্রান্ত কাগজপত্রে স্বাক্ষরকারী হিসেবে যে তিন কর্মকর্তার নাম এসেছে সরকার-স্বীকৃত কোনো সংস্থার বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তাঁদের স্বাক্ষর পরীক্ষা ছাড়াই এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন না করে একটি দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

অবৈধ এনওসিধারী আটক ব্যক্তির কাছে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদের স্বাক্ষর করা এই ফায়ারফাইটিং সনদটিও পাওয়া গেছে।

তবে জানতে চাইলে তিন কর্মকর্তাই দাবি করেন, এ ধরনের বেআইনি কাজের সঙ্গে তাঁরা জড়িত নন এবং অবৈধ কাগজপত্রে তাঁরা স্বাক্ষর করেননি। ক্যাপ্টেন গিয়াস ও ক্যাপ্টেন জসিম এ প্রতিবেদককে বলেন, তদন্তকালে তাঁদেরকে না ডেকে প্রতিবেদনে তাঁদের নাম উল্লেখ করাটা অনৈতিক। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা দু’জন।

প্রাপ্ততথ্য মতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকার ইমিগ্রেশন পুলিশের জিডি নং- ৯০০ এর বরাত দিয়ে গত ২ জুন পুলিশের বিশেষ শাখার একজন বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) স্বাক্ষরিত পত্রে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকে জানানো হয়, “ইমিগ্রেশন শাখা, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের স্বার্থে নিম্নবর্ণিত ব্যক্তির নামে ইস্যুকৃত এনওসি’র সঠিকতা যাচাই করা আবশ্যক। অত্র বিষয়ে তদন্তপূর্বক আপনার লিখিত মতামতসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জরুরিভিত্তিতে অত্র অফিসে প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।”

এই পত্রের সঙ্গে প্রমাণস্বরূপ একটি ছাড়পত্র ও ছাড়পত্রধারী কথিত নাবিকের পাসপোর্টের ছায়ালিপি যুক্ত করা হয়। তাতে দেখা গেছে, ইংরেজিতে লেখা ওই ছাড়পত্রটি অধিদপ্তরেরই একজন কর্মকর্তা দিয়েছেন। তাঁর স্বাক্ষরের নিচে পুরো নাম ড. এস এম নাজমুল হক, ‘ইঞ্জিনিয়ার এ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার এ্যান্ড এক্সামিনার’ এবং ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর ০১৯৮৮-৭৭৭৭৮৮ উল্লেখ ছিলো। ছাড়পত্রধারী ব্যক্তির পরিচয় লেখা ছিলো- মো. মুজাহিদুল ইসলাম, পিতা- আলতাফ হোসেন খান, ইসলামীয়া কলেজ রোড, বয়রা, খুলনার। পাসপোর্ট নং এএফ ১৯৮৩৫৪৩। তবে নাজমুল হক প্রথম থেকেই ছাড়পত্র দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন।

এনওসি কী? সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিকদের চাকরির স্বার্থে দ্রুত কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্য নাবিকরা নৌ পরিবহন অধিদপ্তর থেকে এনওসি বা ছাড়পত্র নিয়ে আকাশপথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পান। তবে এই সুযোগের অপব্যবহার করে অনেক বাংলাদেশি বিভিন্ন সময়ে বিদেশে গিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ায় তা লন্ডনস্থ আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার (আইএমও) সদর দপ্তরের নজরে আসে। এরপর সেখান থেকে বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। আইএমও’র অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গত দুই বছর যাবত এ ধরনের এনওসি বা ছাড়পত্র দেয়া বন্ধ করে দেয় নৌ পরিবহন অধিদপ্তর। ফলে বিদেশে চাকরিপ্রত্যাশী ও চাকরিপ্রাপ্ত নাবিকদের কর্মস্থলে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস থেকে ভিসা নিতে হয়। তবে তিনটি মন্ত্রণালয়ের যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এভাবে ছাড়পত্র দেয়ার ঘটনা জানাজানির পর সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ ওঠে, মোটা অংকের টাকার বিনিময় এই ছাড়পত্র নিয়ে অনেক অপরাধীও দেশ ছাড়ার সুযোগ নিচ্ছে। তাই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের জোরালো দাবি ওঠে।

তদন্ত কমিটি গঠন, পুনর্গঠন ও কালক্ষেপন
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের লিখিত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গত ১৪ জুন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। অধিদপ্তরের ঢাকা (সদরঘাট) কার্যালয়ের ‘প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক’ মীর্জা সাইফুর রহমানকে আহ্বায়ক এবং নির্বাহী হাকিম ও বিশেষ কর্মকর্তা (নৌ নিরাপত্তা) বদরুল হাসান লিটনকে সদস্য করে গঠিত দুই সদস্যের কমিটিকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই মহাপরিচালক তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করেন। পুনর্গঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় চট্টগ্রামের ‘নাবিক ও প্রবাসী কল্যাণ পরিদপ্তর’ এর পরিচালক নুরুল আলম নিজামীকে। তবে এ সংক্রান্ত অফিস আদেশে স্মারক নং ও তারিখ অপরিবর্তিত রাখা হয়। নুরুল আজম নিজামী তদন্তের নামে কালক্ষেপনের একপর্যায়ে গত সেপ্টেম্বরে অন্যত্র বদলি হন। এরপর গত ০২.১০.২০১৬ তারিখ শফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ফের কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। তবে তিনবার আহ্বায়ক বদল করা হলেও কমিটির অপর সদস্য অধিদপ্তরের নির্বাহী হাকিম বদরুল হাসান লিটনকে অপরিবর্তিত রাখা হয়। সর্বশেষ পুনর্গঠিত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কিন্তু শফিকুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন কমিটিও তদন্তের নামে কালক্ষেপন করতে থাকে। শেষপর্যন্ত দীর্ঘ তিন মাস পর গত ৩ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি।

অসম্পূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন, অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
বিমানবন্দরে নৌ অধিদপ্তরের অবৈধ এনওসি আটক, মানব পাচারের অভিযোগ সংক্রান্ত আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়নি। এমনকি তদন্ত কমিটি গঠন সংক্রান্ত অফিস আদেশে যেসব বিষয় অনুসন্ধানপূর্বক তথ্য উদঘাটনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো সে নিদের্শনা মানা হয়নি। প্রকৃত অর্থে প্রতিবেদনে ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। এর বিনিময়ে তিনি মোটা অংকের অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে।

যে কারণে তদন্ত প্রতিবেদন অগ্রণযোগ্য
বিমানবন্দরে আটক হওয়া এনওসি-তে অধিদপ্তরের যে কর্মকর্তার স্বাক্ষর পাওয়া গেছে তিনি (নাজমুল হক) প্রথম থেকেই বলে আসছেন যে, তাঁর প্রকৃত স্বাক্ষর স্ক্যানিংয়ের পর ফটোশপে সুপার ইম্পোজ করে জাল এনওসিতে বসানো হয়েছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “নাজমুল হক বলেছেন তাঁর স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।” তদন্ত কমিটিকে দেয়া নাজমুল হকের বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলেও স্বীকৃত কোনো হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্টের মতামত ছাড়া অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেয়া যায় না। এছাড়া ‘স্বাক্ষর জাল করা’ আর ‘প্রকৃত স্বাক্ষর স্ক্যানিংয়ের পর ফটোশপে সুপার ইম্পোজ করা’ এক কথা নয়। অথচ তদন্ত কমিটি স্বাক্ষরটিকে জাল বলে চালিয়ে দিয়েছে। একইভাবে বিমানবন্দরে আটক মুজাহিদুল ইসলামের জবানবন্দিতে এবং তাঁর দেয়া অন্যান্য কাগজপত্রে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন জসিমউদ্দীনের নাম আসলেও তদন্ত কমিটি তাঁদের স্বাক্ষর পরীক্ষা করেনি, এমনকি তদন্তকালে তাঁদেরকে ডাকাও হয়নি।

স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা উদঘাটনের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ‘হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্ট’ এবং ফটোশপে সুপার ইম্পোজ করার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আইটি এক্সপার্ট (তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ) রয়েছেন। কিন্তু তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে সিআইডি কিংবা অন্য কোনো সংস্থার বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়নি।

তদন্ত কমিটি কেনো ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন ও ক্যাপ্টেন জসিমউদ্দীনকে ডাকলো না, তাঁদের জবানবন্দি নিলো না এবং স্বাক্ষর পরীক্ষা করলো না- তা বেশ রহস্যের সৃষ্টি করেছে। একইভাবে অবৈধ এনওসি ও নৌযানের মাস্টারশিপ-ড্রাইভারশিপ সনদসহ বিভিন্ন ধরনের জাল কাগজপত্র তৈরির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকার জোরালো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অধিদপ্তরের কর্মচারি মিঠুন কুমার চাকীকে সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখায় তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষা ও প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page