খেলাপি ঋণ-মূলধন সংকটে চার ব্যাংক, কার্যক্রম চলছে করের টাকায়

0
 রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক। ফাইল ছবি।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক। ফাইল ছবি।

সহজে মুক্তি মিলছে না রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের। একের পর এক সমস্যা-সংকট লেগেই আছে। এক সময় আর্থিক কেলেঙ্কারি। অন্য সময় মূলধন ঘাটতি। এর সঙ্গে গত কয়েক বছরে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন ঋণ কেলেঙ্কারি। এছাড়া মামলার ঝামেলাতো আছেই। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উদ্বেগ- উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বর্তমানে ব্যাংক চারটি সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ নষ্ট করে টিকে আছে জনগণের করের টাকায়। গত দুই বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার মূলধন দেয়া হলেও অবস্থার উন্নতি ঘটানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি বাড়ছে খেলাপি ঋণ, বাড়ছে লোকসানি শাখাও। সামগ্রিকভাবেই বিভিন্ন আর্থিক সূচকে সংকটজনক পর্যায়ে আছে সরকারি ব্যাংকগুলো। পতন ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত নভেম্বরে চার ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিলেও অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। এখন নতুন করে সরকারের কাছে আরো মূলধন চেয়েছে তারা। এমতাবস্থায় সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ।

ব্যাংকগুলোর উন্নতি চোখে পড়ছে না
পর্যবেক্ষক হিসেবে একটি ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন একজন নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়মিতভাবে পুরো সময়ে পর্ষদ সভায় অংশ নিলেও ব্যাংকগুলোর কোনো উন্নতি চোখে পড়ছে না। আবার উন্নতি করতে হলে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটিও হচ্ছে না। তবে নতুন করে ঋণ কেলেঙ্কারি কিছুটা কমলেও পুরোনো ঋণগুলো দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার, মূলধন ঘাটতি ৪,১০০ কোটি টাকা
জানা যায়, বর্তমানে চার সরকারি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আর মূলধনের ঘাটতি ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর বাইরে এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মিলে ১৮ হাজার ১৬২ কোটি টাকা অবলোপন করেছে, যা মোট খেলাপি ঋণের চেয়েও বেশি। আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলে বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি বৃহৎ ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সুবিধা সিংহভাগই দিয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক।

চার ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১৮৩টি
মূলধন ঘাটতি ও ঋণখেলাপির পাশাপাশি বর্তমানে চার ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১৮৩টি। এর মধ্যে- সোনালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১২৪টি, অগ্রণী ব্যাংকে ৩৪টি, জনতা ব্যাংকে ১৫টি এবং রূপালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ১০টি। মূলত পুরোনো খেলাপি ঋণই খেয়ে ফেলছে ব্যাংকগুলোর মুনাফার বড় অংশ।

সোনালীর ঋণের সাড়ে ২৭ শতাংশই খেলাপি
২০১৫ সালের আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশই খেলাপি। এখানেই শেষ নয়। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করেছে ব্যাংকটি। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে এ বিপুল অর্থ দায়মুক্ত করা হয়েছে। অবলুপ্ত ও খেলাপি ঋণ মিলিয়ে হিসাব করা হলে দেখা যাচ্ছে, সোনালী ব্যাংক যত ঋণ বিতরণ করেছে, তার অর্ধেকেরও বেশি ঋণ ফেরত দেননি গ্রহীতারা।

অগ্রণীর ঋণ ৯,৩৯৪ কোটি টাকাই অনাদায়ির খাতায়
একই বছরের তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ২১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ। পাশাপাশি অবলোপন করা হয়েছে আরো ৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। খেলাপি ও অবলুপ্ত করা ঋণ মিলিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকাই অনাদায়ির খাতায়।

জনতার খেলাপি ঋণ ৬,৪০৭ কোটি টাকা
একইভাবে জনতা ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ৩১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৯ শতাংশই খেলাপি। এই ব্যাংকের অবলুপ্ত করা ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা।

রূপালীর খেলাপি ঋণ ২,৫৬৮ কোটি টাকা
২০১৫ সাল শেষে রূপালী ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ১৩ হাজার ৭৭১ কোটি টাকার মধ্যে ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকাই খেলাপি। অর্থাৎ, মোট ঋণের সোয়া ১১ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। আর এ সময় পর্যন্ত অবলুপ্ত করা হয়েছে ১ হাজার ১৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার একটি ব্যাংক সংস্কার কমিটি গঠন করেছিলো। তখন সেই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। কমিটির প্রতিবেদন দেয়ার ১৬ বছর পর রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নতুন করে তাঁর এ নিয়ে কিছু বলার নেই। কারণ, পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। যদিও ২০০৪ সালে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বড় ধরনের সংস্কারকাজ ঠিকই শুরু করেছিলো সরকার। এ জন্য চারটি ব্যাংকেই পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়। এতে ব্যয় হয় ১৩০ কোটি টাকা। আর পুরো প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিলো প্রায় ৩৯ কোটি ডলার (বর্তমান হিসাবে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি)। এই প্রকল্পের আওতায় ব্যাংকগুলোতে উচ্চ বেতন-ভাতায় চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালে যাতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলতে পারে, সে জন্য চার ব্যাংককে কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়। শুরুতে ব্যাংকগুলো কিছুটা ভালো চলেছিলো। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়েছে। এ সময় ব্যাংকগুলোতে দলের নেতা-কর্মীদের পরিচালক বানানো হয়। এরপর ঘটে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি। পরিস্থিতি নাজুক হয় ব্যাংকগুলোর।

ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোকে ঠিক করতে সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন। বারবার মূলধন জোগান দিয়ে তো আর ঠিক করা যায় না। এসব ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে কঠোর হতে হবে, বারবার পুনর্নিয়োগ দেয়া যাবে না। লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলে প্রয়োজনে পুরো পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাতেই পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর হতে হবে।

সম্পাদনা: রাজু আহমেদ।

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page