অনিয়মের স্বর্গরাজ্য নৌ পরিবহন অধিদপ্তর

বিশেষ সংবাদদাতা, পিটিবিনিউজবিডি.কম

0
* নাজমুল হকের দাপটে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারি তটস্থ!
নৌ পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও এ খাতের উন্নয়নে ইতিবাচকের পরিবর্তে নেতিবাচক ভূমিকাই রেখে চলেছে নৌ পরিবহন অধিদপ্তর (পূর্বনাম সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর)। তবে ইংরেজি নাম ‘ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং বা ডস’ অপরিবর্তিত থাকলেও শুরু থেকেই সংস্থাটি ‘ডিজি শিপিং’ হিসেবেই বহুল পরিচিত। রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নৌ পরিবহন খাতের অত্যাবশ্যকীয় এই অধিদপ্তরটির প্রধান কার্যালয় পরিণত হয়েছে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পরীক্ষক এস এম নাজমুল হক। ছবি: সংগৃহিত
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পরীক্ষক প্রকৌশলী এস এম নাজমুল হক। ছবি: সংগৃহিত

প্রেষণে নিয়োজিত মহাপরিচালক এম জাকিউর রহমান ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম- দুর্নীতির কোনো অভিযোগ তিন বছরেও ওঠেনি। তবে, তাঁর অধস্তন একজন প্রকৌশলীর একক আধিপাত্য কায়েম হয়েছে এখানে। যিনি চার্টার অব ডিউটিজ লঙ্ঘন করে দীর্ঘদিন যাবত তিনটি শীর্ষ পদসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন; যার প্রতিটিতেই রয়েছে সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার ভুরি ভুরি অভিযোগ। তাঁর এসব অপকর্মে প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলামের নিবর ভূমিকা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভাগ্যবান এই কর্মকর্তা হলেন এস এম নাজমুল হক; যিনি দু’বছর আগে থেকে নামের শুরুতে ‘ড.’ শব্দটি লেখা শুরু করেছেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে তাঁর সহকর্মীবৃন্দসহ নৌ সেক্টরে বেশ সমালোচনা রয়েছে। কোথা থেকে কীভাবে এই ডক্টরেট ডিগ্রি (পিএইচডি) সংগ্রহ করেছেন, কোথায় কোন অধ্যাপকের অধীনে থিসিস পেপার (গবেষণাপত্র) জমা দিয়েছেন, গবেষণা কর্ম সম্পাদনের জন্য অধিদপ্তর থেকে ছুটি নিয়েছিলেন কিনা- সে সব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা আজও দেননি তিনি।

হাইলাইটস
* নৌমন্ত্রী, সচিবসহ সরকারদলীয় সাংসদদের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার
* একসঙ্গে তিনটি শীর্ষ পদসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত
* দায়িত্ব প্রাপ্তি ও পালনের ক্ষেত্রে চার্টার অব ডিউটিজ লঙ্ঘন
* মাসে দু’দিন অফিস করলেও সার্ভে- নিবন্ধন হয় দেড় শ’ জাহাজ
* দালাল মারফত মালিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ
* নৌযান না দেখেই বহিরাগতদের দিয়ে সার্ভে- নিবন্ধন সম্পাদন
* ৪০ মিটারের ২০টি বালুবাহী জাহাজকে ২৯ মিটার দেখিয়ে নিবন্ধন

ব্যাখ্যা দেন বা না দেন- তিনি এখন ড. এস এম নাজমুল হক নামেই পরিচিত। তাঁর ফেসবুক পেইজে (https://www.facebook.com/nazmul.huq.3914?fref=ts) পরিচয় হিসেবে লেখা রয়েছে Chief Engineer (Marine) at Department of shipping. যদিও নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের জনবল কাঠামোতে এমন কোনো পদ-পদবির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পরীক্ষক নাজমুল হকের ফেসবুক; যেখানে তাঁর পরিচয় দেয়া হয়েছে চিফ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। অথচ এ নামে কোনো পদ নেই।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পরীক্ষক নাজমুল হকের ফেসবুক; যেখানে তাঁর পরিচয় দেয়া হয়েছে চিফ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। অথচ এ নামে কোনো পদ নেই।

জনশ্রুতি আছে, প্রকৌশলী নাজমুল হকের দাপটে অধিদপ্তরের অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারি সদা তটস্থ থাকেন। কথায় কথায় তিনি নৌ পরিবহনমন্ত্রী, নৌসচিব ও সরকারদলীয় সাংসদের নাম উচ্চারণ করে বলেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পরীক্ষক নাজমুল হকের ফেসবুক; যেখানে তাঁর পরিচয় দেয়া হয়েছে চিফ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। অথচ এ নামে কোনো পদ নেই।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের পরীক্ষক নাজমুল হকের ফেসবুক; যেখানে তাঁর পরিচয় দেয়া হয়েছে চিফ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। অথচ এ নামে কোনো পদ নেই।

যদিও বিএনপি-জামাত শাসনামলে তৎকালীন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ও খুলনা-২ আসনের সাবেক সাংসদ আলী আসগর লবি (বহুল আলোচিত হাওয়া ভবনের মালিক) এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলালের নিকটাত্মীয় বলে পরিচয় দিতেন তিনি। তবে বর্তমান নৌমন্ত্রী, সচিব অথবা সরকারদলীয় কোনো সাংসদ নাজমুল হকের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা নেন কিংবা তাঁর অনৈতিক কাজকে প্রশ্রয় দেন- এমন তথ্য- প্রমাণও মেলেনি। বরং নাজমুল হকের এ ধরনের মিথ্যাচারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রী ও সচিবসহ সাংসদদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করেন।

একাই পাঁচ দায়িত্বে
সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে পাঁচ বছর আগে সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকৌশলী নাজমুল হক অধিদপ্তরে যোগদানের পরপরই প্রধান প্রকৌশলী ও তৎকালীন মহাপরিচালকের বিশেষ আশির্বাদে অভ্যন্তরীণ সেক্টরে ‘ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার’ এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। তবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেলেও তিনি কাগজে- কলমে পদবি হিসেবে ব্যবহার করেন ‘ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার’।

যদিও ডিজি শিপিংয়ে এই নামে কোনো পদ নেই। এছাড়া সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নির্ধারিত দায়িত্বের অতিরিক্ত পালন করলে সে ক্ষেত্রে নাম ও পদবির পরে ‘অতিরিক্ত’ শব্দটি লিখতে হয়। কিন্তু তিনি তা লেখেন না। সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের পরীক্ষক পদে নিয়োগ পেলেও সার্ভেয়ারের পাশাপাশি কিছুদিনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ জাহাজের ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা কমিটির সদস্য করা হয় তাঁকে।

এছাড়া সাবেক মহাপরিচালক তাঁকে নৌযানের নকসা অনুমোদন কমিটির সদস্যও করেন। অভ্যন্তরীণ জাহাজের ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা কমিটি ও নকসা অনুমোদন কমিটির সদস্য- এ দুটিই চার্টার অব ডিউটিজ বহির্ভুত দায়িত্ব। এছাড়া ২০১৪ সালে নৌ মন্ত্রণালয় তাঁকে দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে গৃহিত প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ‘গ্লোবাল মেরিণ ডিস্ট্রেস্ড এন্ড সেফটি সিস্টেম (জিএমডিএসএস)’ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) নিযুক্ত করে।

জাহাজ সার্ভে-নিবন্ধনের নামে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি
প্রকৌশলী নাজমুল হক পাঁচ বছর যাবত নারায়ণগঞ্জ অফিসের ‘ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার’ এর অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসে সর্বোচ্চ দু’দিন যান সেখানে। অথচ তাঁর অধীনে প্রতিমাসে গড়ে দেড় শ’ জাহাজ সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) করা হচ্ছে। এর বাইরে প্রতিমাসে ২০-২৫টি নতুন জাহাজ নিবন্ধন করছেন তিনি। সার্ভে বাবদ যাতায়াত বিল নেওয়ার অজুহাতে জাহাজ-প্রতি সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার থেকে সর্বোচ্চ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

সবই হয় দালাল ও বহিরাগত মারফত। তাঁর শক্তিশালী দালালচক্রের প্রধান হচ্ছেন জনৈক এনামুল হক; যিনি ভিজিটিং কার্ডে ‘এমআর শিপবিল্ডার্স’ এর সত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে ডিজি শিপিংয়ে তাঁর মালিকানায় এই নামে কোনো শিপবিল্ডার্স নেই। বিশ্বস্ত সূত্র মতে, এই এনামুল হক মারফত আসা জাহাজগুলোর সার্ভে ও নিবন্ধনের কাজ এনামুল নিজেই করে থাকেন। নাজমুল হক শুধুমাত্র নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করেন।

বেশকিছু জাহাজের নথি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, মালিকের প্যাডে লেখা আবেদনপত্র, ডিজি শিপিংয়ের নির্ধারিত ফরম পূরণ, বক্স সার্টিফিকেট এবং নতুন জাহাজের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের ক্যাশ মেমো- সব কিছুতেই দালাল এনামুলের নিজ হাতের লেখা রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, নাজমুল হক ও তাঁর সহকর্মীদের কাজগুলো এনামুলই ম্পাদন করে থাকেন।

৪০ মিটারের জাহাজ ২৯ মিটার দেখিয়ে নিবন্ধন
অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ (আইএসও) ১৯৭৬ এর অধীনে প্রণীত সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী, ৩০ মিটারের কর্ম দৈর্ঘ্যরে বালুবাহী জাহাজের নকসা অনুমোদন করার বাধ্যবাধকতা নেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নাজমুল হক প্রতিমাসে অনেক জাহাজের দৈর্ঘ্য কম দেখিয়ে নিবন্ধন দিয়ে থাকেন।

নকসা অনুমোদন না করানোর কারণে অনেক অসৎ মালিক ত্রুটিপূর্ণ জাহাজ নির্মাণ করছেন। এর ফলে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রধান প্রকৌশলী দু’দফায় দেশের বাইরে (১৬-২৪ ফেব্রুয়ারি জেনেভা এবং ১৫-২৫ মার্চ লন্ডন) থাকায় নারায়ণগঞ্জ অফিস থেকে এ ধরনের ৪০টি বালুবাহী জাহাজের নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। নাজমুল হক সার্ভেয়ার হিসেবে নিবন্ধন দেয়ার পর নিজেই অধিকাংশ জাহাজের সার্ভে সনদ জারি করেছেন। প্রধান প্রকৌশলীর অনুপস্থিতিতে তিনি তাঁর দৈনন্দিন দায়িত্বে থাকায় এবং যেহেতু সার্ভে সনদ জারির এখতিয়ার প্রধান প্রকৌশলীর, সেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।

সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী, যিনি জাহাজ সার্ভে করেন তিনি ওই জাহাজের সার্ভে-সনদ জারি করতে পারেন না। অথচ আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নাজমুল হক অহরহ তা করে চলেছেন।

অনুসন্ধানে দৈর্ঘ্য কম দেখিয়ে নিবন্ধন দেয়া এ ধরনের বেশ কয়েটি বালুবাহী জাহাজের নাম পাওয়া গেছে; যেগুলো সবই এসেছে দালাল এনামুল হক মারফত। এর কয়েকটি হচ্ছে- এমবি এ্যানিয়া এন্ড মুনিয়া (এম-১৩৭৫২), এমবি হুরে আরব-৫ (এম-১৩৭৫৩), এমবি শায়েক এন্ড ইতি সরকার (এম-১৩৭৫৪), এমবি আধারের আলো-১ (এম-১৩৭৫৫), এমবি রাজ পরিবহন-১ (এম-১৩৭৫৬) এবং এমবি জাহান আব্দুল্লাহ-৩ (এম-১৩৭৫৭)। এ ছয়টিসহ অন্য সব জাহাজেরই দৈর্ঘ্য ৩৫ থেকে ৪০ মিটার। অথচ নিবন্ধনের কাগজপত্রে প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য দেখানো হয়েছে ২৯ দশমিক….. মিটার; যা তদন্তে প্রমাণিত হবে।

উল্লেখিত ছয়টির মধ্যে এমবি রাজ পরিবহন-১ ছাড়া বাকি পাঁচটি জাহাজের সার্ভে সনদ এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে; যেগুলো জারি করেছেন সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার নাজমুল হক নিজেই। এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার সরকারি চাকরি বিধিমালার সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

অভিযোগ রয়েছে, এভাবে জাহাজ সার্ভে ও নিবন্ধন করার পেছনে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা লেনদেন হয়ে থাকে, যার একটি অংশ সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার পান আর বাকিটা নেন দালালরা।

নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের দালালচক্রের মধ্যে সব চেয়ে বেশি শক্তিশালী এনামুল হক। ছবি: সংগৃহিত
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের দালালচক্রের মধ্যে সব চেয়ে বেশি শক্তিশালী এনামুল হক। ছবি: সংগৃহিত

আরো অভিযোগ রয়েছে, নাজমুল নিজে মাসে দু’দিনের বেশি নারায়ণগঞ্জ অফিসে যান না। শতকরা ৯৫টি জাহাজ তিনি নিজে পরিদর্শন করেন না। ডিজি শিপিংয়ের কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারি নন- তাঁর নিকটাত্মীয় এমন দুই ব্যক্তি এবং দালাল এনামুল হককে দিয়েই মাপ-জোকের কাজ করান। ফলে জাহাজের সঠিক পরিমাপ যেমন হয় না, তেমনি হয় না ইঞ্জিন ও অবকাঠামোগত পরীক্ষাও।

এছাড়া মাপ-জোকের কাজ অধিদপ্তরের পরিদর্শকদের করার বিধান থাকলেও নাজমুল হক কোনো পরিদর্শককে একাজে ব্যবহার করেন না। আর এভাবে প্রতিমাসে গড়ে দেড় শ’ জাহাজ সার্ভে ও নিবন্ধনের নামে তিনি অবৈধভাবে ২০-২৫ লাখ টাকা আয় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিধিবহির্ভুত দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন
নাজমুল হকের বেশ কয়েকটি দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন। ১৬ মে এক যৌথ বিবৃতিতে পরিবেশ ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ-বিষয়ক সংগঠনগুলো বলেছে, একেকজন কর্মকর্তার জন্য ক’টি করে পদ ও দায়িত্ব রয়েছে জাতীয় স্বার্থে দেশবাসী তা জানতে চায়। নৌ পরিবহন অধিদপ্তর, ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (এনএমআই) দু’জন কর্মকর্তার অস্বাভাবিক দায়িত্ব পালন নিয়েও জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন এসব সংগঠনের নেতারা। বিবৃতিদাতা সংগঠনগুলো ও এর নেতারা হলেন- সিটিজেন্স রাইট্স মুভমেন্টের সভাপতি মেজর (অব.) মো. মফিজুল হক সরকার, বাংলাদেশ যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি তুসার রেহমান, মিডিয়া ফোরাম ফর হিউম্যান রাইট্স এন্ড এনভায়রণমেন্টাল ডেভেলপমেন্টের (মেড) নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম সবুজ এবং নদী রক্ষা শপথের (নরশ) আহ্বায়ক জসি সিকদার।

বিবৃতিতে বলা হয়, একাধিক কর্মকর্তা ‘চার্টার অব ডিউটিজ’ বহির্ভুতভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত পদের অতিরিক্ত ৩-৪টি দায়িত্ব পালনের নজিরও রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, পাঁচ বছর আগে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের এক্সামিনার (পরীক্ষক) হিসেবে নিয়োগ পান প্রকৌশলী এস এম নাজমুল হক।

তবে তিনি কর্মস্থলে যোগদানের পরপরই অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সিদ্ধান্তে ‘ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার এন্ড এক্সামিনার’ এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এছাড়া চার্টার অব ডিউটিজে তাঁর অভ্যন্তরীণ জাহাজের ড্রাইভারদের পরীক্ষা নেওয়ার বিধান না থাকলেও বিধি-বিধান লঙ্ঘণ করে তাঁকে অভ্যন্তরীণ জাহাজের পরীক্ষা কমিটিতে রাখা হয়েছে।

এই কর্মকর্তাকে ২০১৪ সালে গ্লোবাল মেরিণ ডিস্ট্রেস্ড এন্ড সেফটি সিস্টেম (জিএমডিএসএস) এর প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত করে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে গৃহীত প্রায় ৪০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের মূল কাজ এখনো শুরু করতে পারেননি নাজমুল হক।

ড্রাইভারশিপ পরীক্ষায় দুর্নীতি
অভিযোগ রয়েছে, অভ্যন্তরীণ জাহাজের ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা গ্রহণের সুযোগে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করেন নাজমুল হক। বর্তমান মহাপরিচাপলক পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার করলেও অবৈধ অর্থ লেনদেন বন্ধ করতে পারেননি। প্রধান প্রকৌশলী ফখরুল ইসলাম পরীক্ষা কমিটির প্রধান হলেও গত তিন বছর যাবত তিনি পরীক্ষার হলে যান না, প্রশ্নপত্র তৈরি করেন না। প্রশ্নপত্র তৈরি করেন নাজমুল হক।

সূত্র মতে, একাধিক সেট প্রশ্নপত্র তৈরির পর সেগুলো মহাপরিচালকের কাছে জমা দেয়া হয় এবং পরীক্ষার দিন সকালে সেখান থেকে পরীক্ষা কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের এক সেট প্রশ্নপত্র দেন মহাপরিচালক। লিখিত পরীক্ষার সময় পরীক্ষা-কক্ষে একজন ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকেন। তবে জনশ্রুতি রয়েছে, পরীক্ষার একদিন আগে নাজমুল হক দালাল মারফত সেই প্রশ্নপত্র তুলে দেন তাঁর সঙ্গে ‘চুক্তিবদ্ধ পরীক্ষার্থী’দের হাতে। ফলে টাকার বিনিময়ে তাঁরাই পাস করেন। এ ক্ষেত্রে মেধা কোনো কাজে আসে না।

জিএমডিএসএস প্রকল্পের নামে হরিলুট
নৌ নিরাপত্তার স্বার্থে দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থ সহায়তায় নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের অধীনে গৃহিত গ্লোবাল মেরিন ডিস্ট্রেস্ড এন্ড সেফটি সিস্টেম (জিএমডিএসএস) প্রকল্পের নামে চলছে সরকারি তহবিলের অর্থ অপচয় ও দুর্নীতি। তথ্যটি চাউর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করেছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি।

একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থে প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর বৃদ্ধি করে নতুন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ এবং গত দুই বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন নিরীক্ষা কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। ১৩ মে এক যুক্ত বিবৃতিতে জাতীয় কমিটির উপদেষ্টা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ মনজুরুল আহসান খান এবং সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আশীষ কুমার দে সরকারের কাছে এই দাবি জানান।

এছাড়া বৈদেশিক অর্থ প্রাপ্তির আগে কেনো বিলাসবহুল একাধিক গাড়ি ক্রয়, বিশাল অফিস ভাড়া ও জনবল নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। প্রকল্পের মূল কাজ শুরুর আগে গত দুই বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কতো টাকা কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে তা জনসমক্ষে প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিতে আন্দোলনরত বেসরকারি এই সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, সমুদ্র উপকূলে নৌ নিরাপত্তা জোরদারকরণের লক্ষ্যে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের অধীনে ৩৭০ কোটি ৮৯ লাখ ৪ হাজার টাকার জিএমডিএসএস প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এই অর্থের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তা ২৮২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। বাকি ৮৮ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার (এঙই)।

প্রকল্পের অধীনে সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলে ফিশিং ট্রলারসহ সব ধরনের জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে কক্সবাজার, কুতুবদিয়া ও সেন্টমার্টিনসহ কয়েকটি এলাকায় লাইট হাউজ এবং রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অধিদপ্তরের নিজস্ব বহুতল ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে।

নৌ মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ২৫ মে একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। অথচ এর মূল কাজ এখনও শুরু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রকল্পের অনুকুলে কোরিয়া সরকার এখনও অর্থ ছাড় করেনি।

বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, বৈদেশিক অর্থ প্রাপ্তির আগেই একাধিক বিলাশবহুল গাড়ি ক্রয়, মতিঝিলে বিশাল অফিস ভাড়া এবং জনবল নিয়োগ দিয়ে তাদের পেছনে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘ দুই বছর ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করা হয়েছে। এখন সরকারি অর্থ সহায়তা তিনগুণ করার পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে। বিৃবতিতে আরো দাবি করা হয়, দক্ষ ও যোগ্য পিডি নিয়োগ না দেয়া হলে বার বার মেয়াদ বাড়িয়েও এ প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না।

কে এই নাজমুল হক?
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) থাকা অবস্থায় তৎকালীন বিএনপির সাংসদ আলী আসগর লবি ও ছাত্রদল নেতা আজিজুল বারী হেলালের প্রভাবে নৌ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘ইঞ্জিনিয়ার এন্ড শিপ সার্ভেয়ার’ পদে সংযুক্তিতে আসেন ডিজি শিপিংয়ে। তখনও পান নারায়ণগঞ্জ অফিসের দায়িত্ব। কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারেননি।

২০০৫ সালে ভোরের কাগজে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়; যার শিরোনাম ছিলো ‘জাহাজ সার্ভের নামে ১০ মাসে কোটি টাকা ঘুষ’। প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়, ‘দিনে ১০টি নৌযান সার্ভে’। এ দুটি খবরের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তৎকালীন নৌমন্ত্রী আকবর হোসেন (প্রয়াত) সংযুক্তি আদেশ বাতিল করে নাজমুল হককে বিএসসিতে ফেরত পাঠান।

সেখানে ফিরে তদবির করে এজিএম থেকে ডিজিএম পদে পদোন্নতি নিয়ে ২০০৭ সালে আবারো ডিজি শিপিংয়ে সার্ভেয়ার হিসেবে আসেন তিনি। এ দফায়ও খুব বেশিদিন টিকতে পারেননি তিনি।

২০০৯ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে ভোলার তেঁতুলিয়া নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি কোকো-৪ দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির পর জানা যায়, ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চটির ফিটনেস সনদ দিয়েছিলেন নাজমুল হক। এই অভিযোগে দু’মাসের মাথায় আবারো বিএসসিতে ফেরত যান তিনি। এরপর বিএসসির চাকরি ছেড়ে চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির ‘সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্ট্রাক্টর’ পদে চাকরি নেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে স্থায়ীভাবে যোগ দেন ডিজি শিপিংয়ে। এখন তিনি রামরাজত্য কায়েম করেছেন এই সংস্থায়।

তবে বিএনপি-জামাত সরকারের আমলে নিজেকে আলী আসগর লবি ও আজিজুল বারী হেলালের নিকটাত্মীয় পরিচয় দিলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তিনি ভোল পাল্টে ফেলেছেন। নিজেকে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠজন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই সাংসদ শেখ হেলালের অনুজ শেখ রুবেলের সহপাঠী ও বন্ধু হিসেবে দাবি করেন।

এই সুবাদে শেখ হেলাল, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকী (শেখ রেহানার দেবর) এবং প্রধানমন্ত্রীর ফুফাতো ভাই সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বাসায় তাঁর অবাধ যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন নাজমুল হক।

এছাড়া পৈত্রিক নিবাস নড়াইলে হওয়া সত্ত্বে এখন তিনি পরিচয় দেন, তাঁর মামার বাড়ি গোপালগঞ্জে এবং শৈশব-কৈশোর সেখানেই কেটেছে তাঁর। তিনি আরো দাবি করেন, নৌমন্ত্রী শাজাহান খান তাঁকে খুব পছন্দ ও স্নেহ করেন এবং সেই সুবাদে মন্ত্রী-ভাবিও (মন্ত্রীর স্ত্রী) তাঁকে পছন্দ করেন।

কয়েকটি অভিযোগ অস্বীকার নাজমুলের
গত ১৮ মে আলাপকালে নাজমুল হক সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “অফিসের কেউ হয়তো আমার বিরুদ্ধে আপনার কাছে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। আজ প্রথম আলো, যুগান্তর ও সমকাল অফিস থেকে ফোন করে বিরক্ত করেছে।” নাজমুল আরো বলেন, “আমি এ মাসেই নারায়ণগঞ্জ অফিসের সার্ভেয়ারের দায়িত্ব ছেড়ে দেবো। আর জিএমডিএসএস প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি। কোরিয়া সরকার টাকা ছাড় না করায় প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারিনি। সংসদীয় কমিটি এই ভেজাল লাগিয়ে দিয়েছে। ওঁদের কারণে প্রকল্প নিয়ে বদনাম হচ্ছে।”

বিদেশী অর্থ ছাড়ের আগে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে না পারলেও বিলাসবহুল অফিস ভাড়া, বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করে সরকারি তহবিলের অর্থ অপচয় প্রসঙ্গে বলেন, “আমি মন্ত্রণালয় ও ডিজি স্যারের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করিনি। বিষয়টি মাননীয় নৌমন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ও জানেন। আর ড্রাইভারশিপ পরীক্ষায় কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই।”

তবে শেখ রুবেল তাঁর বন্ধু ও সহপাঠী, শেখ হেলাল ও শেখ সেলিমের বাসায় অবাধ যাতায়াত এবং নৌমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং তাঁর বাসায় অবাধ যাতায়াত আছে বলে দাবি করেন নাজমুল হক।

দালাল এনামুলের বক্তব্য
অভিযোগ সম্পর্কে ১৯ মে দুপুরে মুঠোফোনে জানতে চাইলে এনামুল হক বলেন, “তাতে আপনার কী হইছে। বিষয়টি ডাইরেক্টর স্যার তদন্ত করছে। এটা দেখার দায়িত্ব নাজমুল স্যারের। আপনাদের মতো সাংবাদিকের না।”

এনামুল আরো বলেন, “অনেক মালিক রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার পর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ৩০ মিটারের বেশি করেছে। যদি তদন্তে ধরা পড়ে তাহলে শাস্তি হবে। ডিজি স্যার আমাকে বলেছেন, ওইসব জাহাজের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে।”

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterPrint this page